আক্রমণে জেগেছে ইরানিদের দেশপ্রেম

ছবি সংগৃহীত

 

সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী : ইরানের মৌলবাদী শাসকরা জনপ্রিয়তা হারিয়েছিলেন। মার্কিন অবরোধ, অভ্যন্তরীণ বেকারত্ব ও নির্যাতনে অতিষ্ঠ হয়ে মানুষ বিক্ষোভ করছিল। ট্রাম্প ও তাঁর সাঙ্গপাঙ্গরা তাই আশা করেছিলেন যে প্রধান নেতা ও কয়েকজন কমান্ডারকে হত্যা করতে পারলে সঙ্গে সঙ্গে বিক্ষুব্ধ মানুষ দলে দলে রাস্তায় বেরিয়ে পড়বে। সরকারের পতন ঘটবে এবং ট্রাম্প সেখানে তাঁর পছন্দের কাউকে ক্ষমতায় বসিয়ে মজাসে ইরানের জ্বালানি তেল ও অন্যান্য সম্পদ লুটপাট করবেন। আর তাঁর বন্ধু ইসরায়েলিরা এগিয়ে যেতে পারবে ফিলিস্তিন দখলের গন্তব্যে। তেমনটা ঘটেনি। ঘটেছে বরং ঠিক উল্টোটা। মাতৃভূমি আক্রান্ত হয়েছে দেখে ইরানের মানুষের দেশপ্রেম জেগে উঠেছে, তারা সরকার ও সশস্ত্র বাহিনীর পেছনে দাঁড়িয়ে গেছে।

ইরানের সংস্কৃতি যে কত প্রাচীন এবং সেখানকার মানুষের দেশপ্রেম যে কেমন গভীর সে সম্পর্কে অর্বাচীন ট্রাম্পের কোনো ধারণাই নেই, থাকার কথাও নয়। প্রাচীন গ্রিকদের নিয়ে ইউরোপের খুবই বড়াই। কিন্তু গ্রিকরা একসময় পারস্যের অধীনে ছিল। এবং পারস্য সংস্কৃতির প্রভাব গ্রিকদের ওপর ভালোভাবেই পড়েছিল। ইতিহাস সাক্ষী, আরবরা ইরানিদের দেশ জয় করেছিল, যার ফলে ইরানিরা ধর্মান্তরিত হয়েছে ঠিকই, কিন্তু ভাষান্তরিত হয়নি। সে তুলনায় আমেরিকানরা তো কেবল যে অর্বাচীন তা-ই নয়, অখণ্ড কোনো ঐতিহাসিক জাতিসত্তার অংশ ভাগীও নয়; তারা বহুজাতির সংমিশ্রণে গঠিত বড় একটি জনগোষ্ঠী বৈ অন্য কিছু নয়। ইরানে সমাজতান্ত্রিক বিপ্লব ঘটার কথা ছিল, ঘটেনি যে তার কারণ একদিকে কমিউনিস্টদের মধ্যকার বিভেদ, অন্যদিকে মার্কিন গোয়েন্দাদের তৎপরতা। বাদশাহতন্ত্রের পতনের পর ইরান চলে যায় ধর্মীয় মৌলবাদীদের হাতে। যাদের শাসন থেকে মানুষ মুক্তি চায় ঠিকই, কিন্তু তাই বলে বিদেশিদের ডেকে আনার চিন্তাকে কণামাত্র প্রশ্রয় দেয় না।

পেশায় এবং স্বভাবে ট্রাম্প একজন ব্যবসায়ী। ইরানের সাংস্কৃতিক জোরটা বোঝার তাঁর ক্ষমতা নেই, আগ্রহও নেই। তিনি মুনাফা ছাড়া অন্য কিছুকে পাত্তা দেন না। ট্রাম্প আওয়াজ দিয়েছেন আমেরিকা আবার বড় হবে, তাঁর কাছে এবং তাঁর মতোদের কাছে বড় হওয়া অর্থ মহৎ হওয়া নয়, বৃহৎ হওয়া মাত্র। তাদের আমেরিকা বৃহৎ হবে সংস্কৃতিতে নয়, ধনদৌলতে। সেজন্য তিনি শুল্কযুদ্ধ শুরু করেছেন, জবরদখলদারত্বের দিকেও হাত বাড়িয়েছেন।

সঙ্গে আছেন তাঁর সেই সব দেশবাসী যাঁরা শ্বেতাঙ্গ আধিপত্যে বিশ্বাস করে, অর্ধশিক্ষাকেই যারা যথেষ্ট শিক্ষা মনে করে এবং আত্মসুখের বাইরে যারা অন্য কোনো সুখের কথা ভাবতেই পারে না।

তবে আমেরিকার জন্য ট্রাম্প এবং ট্রাম্পইজমই যে একমাত্র সত্য, তা মোটেই নয়; আমেরিকার ইতিহাসে অনেক মহৎ মানুষের বড় বড় অবদান রয়েছে। সাহিত্যে, সংগীতে, বিজ্ঞানে, চলচ্চিত্রে, খেলাধুলায় এবং রাজনৈতিক আন্দোলন ও চিন্তায় আমেরিকা বিশ্বকে কম সমৃদ্ধ করেনি। বিপন্ন মানুষকে আশ্রয়ও দিয়েছে।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের মধ্যেই বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর আমেরিকার ওপর যে আস্থা ব্যক্ত করেছিলেন, সে ঘটনাটা মোটেই উপেক্ষণীয় নয়। প্রথম বিশ্বযুদ্ধ শুরুর আগে তিনি সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার পান। তাতে বিশ্বব্যাপী তাঁর রচনা ও ব্যক্তিত্বের সুখ্যাতি ছড়িয়ে পড়ে। ১৯১৭ সালে, বিশ্বযুদ্ধ যখন প্রচণ্ড আকার ধারণ করেছে, তখন ‘ন্যাশনালিজম’-এর ওপর রবীন্দ্রনাথ তিনটি বক্তৃতা দেন- একটি জাপানে, দুটি আমেরিকায়। বক্তৃতা তিনটিতে জাতীয়তাবাদের বিরুদ্ধে তিনি তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেন। আসলে রবীন্দ্রনাথের বিতৃষ্ণাটা ছিল পুঁজিবাদ-সাম্রাজ্যবাদের ওপর। ওই ধারার জাতীয়তাবাদের ওপরই ছিল তাঁর প্রবল ঘৃণা। কিন্তু তিনি পুঁজিবাদ-সাম্রাজ্যবাদকে স্পষ্টভাবে চিহ্নিত করেননি। সেখানেই অবশ্য ছিল তাঁর উদারনৈতিক রাজনৈতিক চিন্তার সীমাবদ্ধতা।

আমেরিকা নিজেই যে পুঁজিবাদী-সাম্রাজ্যবাদী হয়ে উঠবে এটা তখন তাঁর অসামান্য কল্পনাশক্তির আওতার ভিতর প্রবেশাধিকার পায়নি। তিনি দেখছিলেন যে ইউরোপের পক্ষে বিশ্বকে আর বিশেষ কিছু দেওয়া সম্ভব নয়। সে আবদ্ধ হয়ে পড়েছে নিজের স্বপ্নের, অভ্যাসের ও প্রথার বন্ধনে। তাকে বুঝি হতাশায় পেয়েছে; হতে পারে বিরাগীই হয়ে পড়েছে। আমেরিকা সে-তুলনায় মুক্ত; অতীত তার জন্য কোনো বন্ধন নয়, এবং এখন তার ভরাযৌবন। তার নবীনতা তাকে নতুন নতুন পরীক্ষানিরীক্ষায় উদ্বুদ্ধ করছে এবং করবে। রবীন্দ্রনাথের মনে হয়েছিল বিশ্ব-ইতিহাস একটি ক্রান্তি-মুহূর্তে এসে পৌঁছেছে। ধ্বংসের মধ্য থেকেই নতুন এক যুগ আসবে, আমেরিকা ওই নতুন যুগের বার্তা নিয়ে যাবে মানুষের কাছে। তিনি আরও আশা করেন, আমেরিকার জন্য ওই ভূমিকাও হয়তো নির্দিষ্ট হয়ে আছে যে সে পশ্চিমের সভ্যতাকে পূর্বের কাছে ন্যায্যতা দেবে, যেটা করার ক্ষমতা ইউরোপ নিঃশেষ করে ফেলেছে।

১৯১৭ সালে আমেরিকার পক্ষে অতীত ঐতিহ্যের বোঝা বহনের দায়িত্ব থেকে মুক্ত থাকার সুবিধার কথা রবীন্দ্রনাথ বলেছেন, ১৯৩২ সালে দেখা যাচ্ছে- তিনি আমেরিকার জন্য আরও একটি সুবিধার কথা ভাবছেন। সেটি ভৌগোলিক। ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে আমেরিকা বিশ্বের ঘটনাপ্রবাহকে নিরাসক্ত চোখে দেখতে পারবে এবং আমেরিকার পক্ষে উচিত হবে এগিয়ে এসে মনুষ্যজগতকে পারস্পরিক সমঝোতা ও সহযোগিতায় এক ভবিষ্যতের অভিমুখে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার ব্যাপারে নেতৃত্ব দান করা।

বোঝা যাচ্ছিল যে ইউরোপে আস্থা হারালেও পশ্চিমের ওপর রবীন্দ্রনাথের আস্থা তখনো অটুটই ছিল। এবং সেটা যে তাঁর একার নয়, সে সময়ে তাঁর মতো অনেক উদারনীতিকের ভাবনার ভিতরেই তা কাজ করছিল। পশ্চিমের প্রতি রবীন্দ্রনাথের উদারনৈতিক ওই বিশ্বাস অবশ্য দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় আর টিকে থাকেনি। সম্পূর্ণ বিধ্বস্ত হয়ে গিয়েছিল। ১৯৪১ সালে, মৃত্যুর মাত্র তিন মাস পূর্বে, ২৫ বৈশাখে শান্তিনিকেতনে জন্মদিনের সর্বশেষ অনুষ্ঠানে তাঁর যে বক্তব্য পঠিত হয়েছিল, ‘সভ্যতার সংকট’ নামের সেই অবিস্মরণীয় বক্তৃতাটিতে কেবল ইউরোপ নয়, সমগ্র পশ্চিমী সভ্যতার ওপরই তাঁর আস্থা বিনষ্ট হয়ে যাওয়ার কথাটা জোর দিয়েই তিনি বলেন। এবং বিশেষ করে ইংরেজ শাসনকে তিনি ধিক্কার দিয়েছেন। পশ্চিমের ওপর আস্থা নিঃশেষ হয়ে গেছে বলে তিনি যে আশাভরসাহীন হয়ে পড়েছিলেন তা কিন্তু নয়। তিনি আস্থা রাখেন মানুষের মনুষ্যত্বের ওপর। সারা জীবন যেমন বলেছেন, জীবনসায়াহ্নেও তেমনি বলে গেছেন সেই আশার কথা। তাঁর ভাষায়, ‘আশা করব মহাপ্রলয়ের পরে বৈরাগ্যের মেঘমুক্ত আকাশে ইতিহাসের একটি নির্মল আত্মপ্রকাশ হয়তো আরম্ভ হবে এই পূর্বাচলের সূর্যোদয়ের দিগন্ত থেকে।’

পূর্বাচলের নতুন দিগন্ত বলতে কিন্তু তিনি যে সাম্রাজ্যবাদী জাপানকে ভেবেছেন, তা অবশ্যই নয়। জেগে ওঠা চীনের কথাও তাঁর চিন্তায় আসার কথা নয়। কেননা চীন এগোচ্ছিল সমাজতন্ত্রের দিকে। আর রুশ দেশের উন্নতি দেখে তিনি অত্যন্ত প্রীত হয়েছিলেন সত্য, কিন্তু যে বিপ্লবের মধ্য দিয়ে ওই উন্নতি সাধিত হয়েছিল, সেটির প্রতি মোটেই তাঁর সমর্থন ছিল না। ১৯১৭ সালে তিনি যখন আমেরিকার ওপর ভরসার কথা জানাচ্ছিলেন, সেই সময়েই তো পশ্চিমে নয়, পূর্বাঞ্চলেই বলশেভিকরা প্রাণপণে লড়ছিলেন পুঁজিবাদ-সাম্রাজ্যবাদ হটিয়ে দিয়ে সমাজতান্ত্রিক ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার জন্য; যার খবর তাঁর অজানা থাকার কথা নয়। কিন্তু রুশদের ওই উদ্যোগকে সমর্থন করবেন কী, রুশ বিপ্লবকে ধ্বংস করার জন্য তৎপর হচ্ছিল যে আমেরিকা- তাকেই তিনি বিশ্ব-নেতৃত্ব গ্রহণ করবার জন্য অনুরোধ জানাচ্ছিলেন।

রবীন্দ্রনাথের বিষয়ে এত সব কথা বলার দরকার পড়ে এই জন্য যে উপমহাদেশে সামাজিক বিপ্লব না ঘটার পেছনে যে ভাববাদী-উদারনৈতিক চিন্তাধারা কার্যকর ছিল এবং এখনো রয়েছে সেটিকে শক্তিশালী করার ক্ষেত্রে যে দুজন অত্যন্ত প্রভাবশালী ব্যক্তির বিশেষ রকমের ভূমিকা ছিল, তাঁদের একজন যদি হন রাজনীতিবিদ মোহনদাস করমচাঁদ গান্ধী, তবে অন্যজন অবশ্যই কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। যদিও তাঁদের মধ্যে মতপার্থক্যের এলাকাটা নিতান্ত সংকীর্ণ ছিল না।

ইরান আর ট্রাম্প নিয়ে শুরু করেছিলাম। উপসংহারে সে দিকেই যাই। সর্বশেষ বিশ্বপট বলছে- মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের ক্রমাগত হুমকি, ব্যক্তিনির্ভর কূটনীতি এবং বিভিন্ন দেশে দুর্বল হয়ে পড়া মার্কিন দূতাবাস, আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ওয়াশিংটনের উপস্থিতির ধরন বদলে দিচ্ছে। ইউরোপ থেকে এশিয়া পর্যন্ত মিত্র দেশগুলো এখন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে যোগাযোগের নতুন কৌশল খুঁজছে। অনেক ক্ষেত্রে তারা ট্রাম্পের বক্তব্য উপেক্ষা করে বিকল্প কূটনৈতিক পথ তৈরির চেষ্টা করছে। কারণ মার্কিন পররাষ্ট্রনীতি ক্রমশ প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো থেকে সরে  ব্যক্তি ও ক্ষমতার ঘনিষ্ঠ বৃত্তকেন্দ্রিক হয়ে উঠছে। প্রগতিশীল মার্কিনিরাও এটা পছন্দ করছেন না। তারা লাখে লাখে পথে নেমেও এসেছিলেন। আর ইরান নিয়ে যা ঘটেছে বা ঘটছে- তা আসলে বিচ্ছিন্ন কিছু নয়; বরং তাতে যুক্তরাষ্ট্রের কূটনৈতিক ব্যবস্থার সাম্প্রতিক গভীর সংকট ফুটে উঠেছে।

♦ লেখক : ইমেরিটাস অধ্যাপক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

 সূএ : বাংলাদেশ প্রতিদিন

এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ



সর্বশেষ আপডেট



» রাশিয়ার শ্রমবাজারে ১ লাখ কর্মী পাঠাতে চায় বাংলাদেশ, সম্মত রুশ কর্তৃপক্ষ

» সরকারকে ব্যর্থ প্রমাণে বিভ্রান্তি ছড়াচ্ছে বিরোধী দল: ইশরাক

» নির্বাচনের আগে জামায়াতের গাড়ি-বাড়ি লাগত না, কিন্তু পরে সব লাগে : রাশেদ খান

» বিদ্যুতের প্রিপেইড মিটারের ফাঁদে অসহায় গ্রাহক

» গরমে শিশুর ডায়রিয়ার ঝুঁকি, যা জানা জরুরি

» মোসাদ্দেক–হৃদয়ে ভর করে লড়ছে বাংলাদেশ

» থ্রি-হুইলার আটক করায় হাইওয়ে পুলিশের গাড়িতে হামলা

» সুপ্রিমকোর্ট সচিবালয় প্রতিষ্ঠা নিয়ে হাইকোর্টের রায় আপিল বিভাগে স্থগিত

» যেসব উপকার মিলবে জাম খেলে

» কাঁঠালের বিচির হালুয়ার তৈরির রেসিপি

 

সম্পাদক ও প্রকাশক :মো সেলিম আহম্মেদ,

ভারপ্রাপ্ত,সম্পাদক : মোঃ আতাহার হোসেন সুজন,

নির্বাহী সম্পাদকঃ আনিসুল হক বাবু

 

ইমেল: [email protected]

ফোন নাম্বার : ০১৫৩৫১৩০৩৫০,

Desing & Developed BY PopularITLtd.Com
পরীক্ষামূলক প্রচার...

আক্রমণে জেগেছে ইরানিদের দেশপ্রেম

ছবি সংগৃহীত

 

সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী : ইরানের মৌলবাদী শাসকরা জনপ্রিয়তা হারিয়েছিলেন। মার্কিন অবরোধ, অভ্যন্তরীণ বেকারত্ব ও নির্যাতনে অতিষ্ঠ হয়ে মানুষ বিক্ষোভ করছিল। ট্রাম্প ও তাঁর সাঙ্গপাঙ্গরা তাই আশা করেছিলেন যে প্রধান নেতা ও কয়েকজন কমান্ডারকে হত্যা করতে পারলে সঙ্গে সঙ্গে বিক্ষুব্ধ মানুষ দলে দলে রাস্তায় বেরিয়ে পড়বে। সরকারের পতন ঘটবে এবং ট্রাম্প সেখানে তাঁর পছন্দের কাউকে ক্ষমতায় বসিয়ে মজাসে ইরানের জ্বালানি তেল ও অন্যান্য সম্পদ লুটপাট করবেন। আর তাঁর বন্ধু ইসরায়েলিরা এগিয়ে যেতে পারবে ফিলিস্তিন দখলের গন্তব্যে। তেমনটা ঘটেনি। ঘটেছে বরং ঠিক উল্টোটা। মাতৃভূমি আক্রান্ত হয়েছে দেখে ইরানের মানুষের দেশপ্রেম জেগে উঠেছে, তারা সরকার ও সশস্ত্র বাহিনীর পেছনে দাঁড়িয়ে গেছে।

ইরানের সংস্কৃতি যে কত প্রাচীন এবং সেখানকার মানুষের দেশপ্রেম যে কেমন গভীর সে সম্পর্কে অর্বাচীন ট্রাম্পের কোনো ধারণাই নেই, থাকার কথাও নয়। প্রাচীন গ্রিকদের নিয়ে ইউরোপের খুবই বড়াই। কিন্তু গ্রিকরা একসময় পারস্যের অধীনে ছিল। এবং পারস্য সংস্কৃতির প্রভাব গ্রিকদের ওপর ভালোভাবেই পড়েছিল। ইতিহাস সাক্ষী, আরবরা ইরানিদের দেশ জয় করেছিল, যার ফলে ইরানিরা ধর্মান্তরিত হয়েছে ঠিকই, কিন্তু ভাষান্তরিত হয়নি। সে তুলনায় আমেরিকানরা তো কেবল যে অর্বাচীন তা-ই নয়, অখণ্ড কোনো ঐতিহাসিক জাতিসত্তার অংশ ভাগীও নয়; তারা বহুজাতির সংমিশ্রণে গঠিত বড় একটি জনগোষ্ঠী বৈ অন্য কিছু নয়। ইরানে সমাজতান্ত্রিক বিপ্লব ঘটার কথা ছিল, ঘটেনি যে তার কারণ একদিকে কমিউনিস্টদের মধ্যকার বিভেদ, অন্যদিকে মার্কিন গোয়েন্দাদের তৎপরতা। বাদশাহতন্ত্রের পতনের পর ইরান চলে যায় ধর্মীয় মৌলবাদীদের হাতে। যাদের শাসন থেকে মানুষ মুক্তি চায় ঠিকই, কিন্তু তাই বলে বিদেশিদের ডেকে আনার চিন্তাকে কণামাত্র প্রশ্রয় দেয় না।

পেশায় এবং স্বভাবে ট্রাম্প একজন ব্যবসায়ী। ইরানের সাংস্কৃতিক জোরটা বোঝার তাঁর ক্ষমতা নেই, আগ্রহও নেই। তিনি মুনাফা ছাড়া অন্য কিছুকে পাত্তা দেন না। ট্রাম্প আওয়াজ দিয়েছেন আমেরিকা আবার বড় হবে, তাঁর কাছে এবং তাঁর মতোদের কাছে বড় হওয়া অর্থ মহৎ হওয়া নয়, বৃহৎ হওয়া মাত্র। তাদের আমেরিকা বৃহৎ হবে সংস্কৃতিতে নয়, ধনদৌলতে। সেজন্য তিনি শুল্কযুদ্ধ শুরু করেছেন, জবরদখলদারত্বের দিকেও হাত বাড়িয়েছেন।

সঙ্গে আছেন তাঁর সেই সব দেশবাসী যাঁরা শ্বেতাঙ্গ আধিপত্যে বিশ্বাস করে, অর্ধশিক্ষাকেই যারা যথেষ্ট শিক্ষা মনে করে এবং আত্মসুখের বাইরে যারা অন্য কোনো সুখের কথা ভাবতেই পারে না।

তবে আমেরিকার জন্য ট্রাম্প এবং ট্রাম্পইজমই যে একমাত্র সত্য, তা মোটেই নয়; আমেরিকার ইতিহাসে অনেক মহৎ মানুষের বড় বড় অবদান রয়েছে। সাহিত্যে, সংগীতে, বিজ্ঞানে, চলচ্চিত্রে, খেলাধুলায় এবং রাজনৈতিক আন্দোলন ও চিন্তায় আমেরিকা বিশ্বকে কম সমৃদ্ধ করেনি। বিপন্ন মানুষকে আশ্রয়ও দিয়েছে।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের মধ্যেই বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর আমেরিকার ওপর যে আস্থা ব্যক্ত করেছিলেন, সে ঘটনাটা মোটেই উপেক্ষণীয় নয়। প্রথম বিশ্বযুদ্ধ শুরুর আগে তিনি সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার পান। তাতে বিশ্বব্যাপী তাঁর রচনা ও ব্যক্তিত্বের সুখ্যাতি ছড়িয়ে পড়ে। ১৯১৭ সালে, বিশ্বযুদ্ধ যখন প্রচণ্ড আকার ধারণ করেছে, তখন ‘ন্যাশনালিজম’-এর ওপর রবীন্দ্রনাথ তিনটি বক্তৃতা দেন- একটি জাপানে, দুটি আমেরিকায়। বক্তৃতা তিনটিতে জাতীয়তাবাদের বিরুদ্ধে তিনি তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেন। আসলে রবীন্দ্রনাথের বিতৃষ্ণাটা ছিল পুঁজিবাদ-সাম্রাজ্যবাদের ওপর। ওই ধারার জাতীয়তাবাদের ওপরই ছিল তাঁর প্রবল ঘৃণা। কিন্তু তিনি পুঁজিবাদ-সাম্রাজ্যবাদকে স্পষ্টভাবে চিহ্নিত করেননি। সেখানেই অবশ্য ছিল তাঁর উদারনৈতিক রাজনৈতিক চিন্তার সীমাবদ্ধতা।

আমেরিকা নিজেই যে পুঁজিবাদী-সাম্রাজ্যবাদী হয়ে উঠবে এটা তখন তাঁর অসামান্য কল্পনাশক্তির আওতার ভিতর প্রবেশাধিকার পায়নি। তিনি দেখছিলেন যে ইউরোপের পক্ষে বিশ্বকে আর বিশেষ কিছু দেওয়া সম্ভব নয়। সে আবদ্ধ হয়ে পড়েছে নিজের স্বপ্নের, অভ্যাসের ও প্রথার বন্ধনে। তাকে বুঝি হতাশায় পেয়েছে; হতে পারে বিরাগীই হয়ে পড়েছে। আমেরিকা সে-তুলনায় মুক্ত; অতীত তার জন্য কোনো বন্ধন নয়, এবং এখন তার ভরাযৌবন। তার নবীনতা তাকে নতুন নতুন পরীক্ষানিরীক্ষায় উদ্বুদ্ধ করছে এবং করবে। রবীন্দ্রনাথের মনে হয়েছিল বিশ্ব-ইতিহাস একটি ক্রান্তি-মুহূর্তে এসে পৌঁছেছে। ধ্বংসের মধ্য থেকেই নতুন এক যুগ আসবে, আমেরিকা ওই নতুন যুগের বার্তা নিয়ে যাবে মানুষের কাছে। তিনি আরও আশা করেন, আমেরিকার জন্য ওই ভূমিকাও হয়তো নির্দিষ্ট হয়ে আছে যে সে পশ্চিমের সভ্যতাকে পূর্বের কাছে ন্যায্যতা দেবে, যেটা করার ক্ষমতা ইউরোপ নিঃশেষ করে ফেলেছে।

১৯১৭ সালে আমেরিকার পক্ষে অতীত ঐতিহ্যের বোঝা বহনের দায়িত্ব থেকে মুক্ত থাকার সুবিধার কথা রবীন্দ্রনাথ বলেছেন, ১৯৩২ সালে দেখা যাচ্ছে- তিনি আমেরিকার জন্য আরও একটি সুবিধার কথা ভাবছেন। সেটি ভৌগোলিক। ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে আমেরিকা বিশ্বের ঘটনাপ্রবাহকে নিরাসক্ত চোখে দেখতে পারবে এবং আমেরিকার পক্ষে উচিত হবে এগিয়ে এসে মনুষ্যজগতকে পারস্পরিক সমঝোতা ও সহযোগিতায় এক ভবিষ্যতের অভিমুখে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার ব্যাপারে নেতৃত্ব দান করা।

বোঝা যাচ্ছিল যে ইউরোপে আস্থা হারালেও পশ্চিমের ওপর রবীন্দ্রনাথের আস্থা তখনো অটুটই ছিল। এবং সেটা যে তাঁর একার নয়, সে সময়ে তাঁর মতো অনেক উদারনীতিকের ভাবনার ভিতরেই তা কাজ করছিল। পশ্চিমের প্রতি রবীন্দ্রনাথের উদারনৈতিক ওই বিশ্বাস অবশ্য দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় আর টিকে থাকেনি। সম্পূর্ণ বিধ্বস্ত হয়ে গিয়েছিল। ১৯৪১ সালে, মৃত্যুর মাত্র তিন মাস পূর্বে, ২৫ বৈশাখে শান্তিনিকেতনে জন্মদিনের সর্বশেষ অনুষ্ঠানে তাঁর যে বক্তব্য পঠিত হয়েছিল, ‘সভ্যতার সংকট’ নামের সেই অবিস্মরণীয় বক্তৃতাটিতে কেবল ইউরোপ নয়, সমগ্র পশ্চিমী সভ্যতার ওপরই তাঁর আস্থা বিনষ্ট হয়ে যাওয়ার কথাটা জোর দিয়েই তিনি বলেন। এবং বিশেষ করে ইংরেজ শাসনকে তিনি ধিক্কার দিয়েছেন। পশ্চিমের ওপর আস্থা নিঃশেষ হয়ে গেছে বলে তিনি যে আশাভরসাহীন হয়ে পড়েছিলেন তা কিন্তু নয়। তিনি আস্থা রাখেন মানুষের মনুষ্যত্বের ওপর। সারা জীবন যেমন বলেছেন, জীবনসায়াহ্নেও তেমনি বলে গেছেন সেই আশার কথা। তাঁর ভাষায়, ‘আশা করব মহাপ্রলয়ের পরে বৈরাগ্যের মেঘমুক্ত আকাশে ইতিহাসের একটি নির্মল আত্মপ্রকাশ হয়তো আরম্ভ হবে এই পূর্বাচলের সূর্যোদয়ের দিগন্ত থেকে।’

পূর্বাচলের নতুন দিগন্ত বলতে কিন্তু তিনি যে সাম্রাজ্যবাদী জাপানকে ভেবেছেন, তা অবশ্যই নয়। জেগে ওঠা চীনের কথাও তাঁর চিন্তায় আসার কথা নয়। কেননা চীন এগোচ্ছিল সমাজতন্ত্রের দিকে। আর রুশ দেশের উন্নতি দেখে তিনি অত্যন্ত প্রীত হয়েছিলেন সত্য, কিন্তু যে বিপ্লবের মধ্য দিয়ে ওই উন্নতি সাধিত হয়েছিল, সেটির প্রতি মোটেই তাঁর সমর্থন ছিল না। ১৯১৭ সালে তিনি যখন আমেরিকার ওপর ভরসার কথা জানাচ্ছিলেন, সেই সময়েই তো পশ্চিমে নয়, পূর্বাঞ্চলেই বলশেভিকরা প্রাণপণে লড়ছিলেন পুঁজিবাদ-সাম্রাজ্যবাদ হটিয়ে দিয়ে সমাজতান্ত্রিক ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার জন্য; যার খবর তাঁর অজানা থাকার কথা নয়। কিন্তু রুশদের ওই উদ্যোগকে সমর্থন করবেন কী, রুশ বিপ্লবকে ধ্বংস করার জন্য তৎপর হচ্ছিল যে আমেরিকা- তাকেই তিনি বিশ্ব-নেতৃত্ব গ্রহণ করবার জন্য অনুরোধ জানাচ্ছিলেন।

রবীন্দ্রনাথের বিষয়ে এত সব কথা বলার দরকার পড়ে এই জন্য যে উপমহাদেশে সামাজিক বিপ্লব না ঘটার পেছনে যে ভাববাদী-উদারনৈতিক চিন্তাধারা কার্যকর ছিল এবং এখনো রয়েছে সেটিকে শক্তিশালী করার ক্ষেত্রে যে দুজন অত্যন্ত প্রভাবশালী ব্যক্তির বিশেষ রকমের ভূমিকা ছিল, তাঁদের একজন যদি হন রাজনীতিবিদ মোহনদাস করমচাঁদ গান্ধী, তবে অন্যজন অবশ্যই কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। যদিও তাঁদের মধ্যে মতপার্থক্যের এলাকাটা নিতান্ত সংকীর্ণ ছিল না।

ইরান আর ট্রাম্প নিয়ে শুরু করেছিলাম। উপসংহারে সে দিকেই যাই। সর্বশেষ বিশ্বপট বলছে- মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের ক্রমাগত হুমকি, ব্যক্তিনির্ভর কূটনীতি এবং বিভিন্ন দেশে দুর্বল হয়ে পড়া মার্কিন দূতাবাস, আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ওয়াশিংটনের উপস্থিতির ধরন বদলে দিচ্ছে। ইউরোপ থেকে এশিয়া পর্যন্ত মিত্র দেশগুলো এখন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে যোগাযোগের নতুন কৌশল খুঁজছে। অনেক ক্ষেত্রে তারা ট্রাম্পের বক্তব্য উপেক্ষা করে বিকল্প কূটনৈতিক পথ তৈরির চেষ্টা করছে। কারণ মার্কিন পররাষ্ট্রনীতি ক্রমশ প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো থেকে সরে  ব্যক্তি ও ক্ষমতার ঘনিষ্ঠ বৃত্তকেন্দ্রিক হয়ে উঠছে। প্রগতিশীল মার্কিনিরাও এটা পছন্দ করছেন না। তারা লাখে লাখে পথে নেমেও এসেছিলেন। আর ইরান নিয়ে যা ঘটেছে বা ঘটছে- তা আসলে বিচ্ছিন্ন কিছু নয়; বরং তাতে যুক্তরাষ্ট্রের কূটনৈতিক ব্যবস্থার সাম্প্রতিক গভীর সংকট ফুটে উঠেছে।

♦ লেখক : ইমেরিটাস অধ্যাপক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

 সূএ : বাংলাদেশ প্রতিদিন

এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ



সর্বশেষ আপডেট



সর্বাধিক পঠিত



 

সম্পাদক ও প্রকাশক :মো সেলিম আহম্মেদ,

ভারপ্রাপ্ত,সম্পাদক : মোঃ আতাহার হোসেন সুজন,

নির্বাহী সম্পাদকঃ আনিসুল হক বাবু

 

ইমেল: [email protected]

ফোন নাম্বার : ০১৫৩৫১৩০৩৫০,

Design & Developed BY ThemesBazar.Com